বয়ঃসন্ধিকালের লক্ষণ, শারীরিক ও মানসিক যত্নসহ স্বাস্থ্যকর খাবার

0
38

বয়ঃসন্ধিকাল কী?

বয়ঃসন্ধিকাল হল শৈশব থেকে যৌবনে পদার্পণ করার মধ্যবর্তী সময় । ১০ – ১৯ বছরের কিশোর-কিশোরীদের বয়ঃসন্ধি বা টিনএজার বলা হয় । বয়ঃসন্ধিকালের পূর্বে নিষ্ক্রিয় থাকা হাইপোথ্যালামাস এ সময় হঠাৎ করে সক্রিয় হয়ে ওঠে ।

শিশুর বয়ঃসন্ধিকাল

সাধারনত শিশুর বয়ঃসন্ধিকাল হয় ১৩-১৯ বছরের মধ্যে।এ সময় শরীরে নানা হরমোনের জন্য তাদের মেজাজ খিটখিটে হয় এবং তাদের আচরণে ভিন্ন পরিবর্তন দেখা যায়। এ জন্য শিশুরা সাধারণ শিশুদের থেকে আলাদা হয় এবং এ সময় শিশুরা নিজেদের মতো একা থাকতে চায়।  গবেষণায়  জানা যায় সব  শিশুদের এ সময় মেজাজ খুব অন্যরকম থাকে, এ ধরণের আচরণকে মুড সুইং বলা হয়। এ জন্য কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হবে এবং যার কয়েকটি  উপায় হলো—

বলার আগে ভাবুন

শিশু কথা শুনতে না চাইলে ,আচার  আচরণ পছন্দ না হলে সব বাবা -মার মেজাজ খারাপ হয়। এ সময় রাগ হলেও সন্থানকে গালিগালাজ করা যাবে না বা মন্ধ কিছু বলা যাবে না বরং সন্তানকে ভালোভাবে বোঝাতে হবে এবং তাদের সাথে ভালো করে কথা বলতে হবে।

শিশুর দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখুন

শিশুর কোনো চাওয়া পাওয়া বা আচরণ ভালো লাগতে না পারে , তার এই  চাহিদার ওপর বিরক্ততো না হয়ে তার জায়গায় নিজেকে বসান আর ভাবুন এটি যৌক্তিক কি না। বাবা -মার সাধারণ  ভুল হলো তারা জানতে চায় না  শিশুর মনের মধ্যে কি চলছে। শিশুর কোনো অযৌক্তিক আবদার নিষেদ না করে আগে তাকে জিজ্ঞেস করুন ,কেন সে  এ আবদার  করলো এবং তার  ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে সাহায্য করুন।

শান্ত থাকুন

সন্তানের  বয়ঃসন্ধিকালের সময়টা সর্বোচ্চ শান্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে এবং মেজাজ উপক্রম হলে বড় করে শ্বাস নিন এবং ধীরে ধীরে ছাড়ুন। এ সময় সন্তানকে একটু  সময় দিন এবং ভালো না লাগলে একা একা সময় কাটান।

শিশুকে স্বাধীনতা দিন

বয়ঃসন্ধিকালে  শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন দেখে অনেক শিশু ঘাবড়ে যায় এবং এ রকম অবস্থাতে তারা একা একা থাকতে চায় বা পছন্দ করে ,এ সময় তাকে নিজেকে বুঝতে সাহায্য  করুন এবং  তাদের জানান যে এ রকম সবার হয় ও সবার জীবনেই আসে। বয়ঃসন্ধিকাল সময়ে তাদের সাথে   মুক্ত মনে কথা বলতে হবে এবং ভাল ও খারাপ বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করতে হবে এবং সর্বোপরি সন্তানের সাথে বেশি সময় ব্যয় করতে হবে যেন  ভালোবাসা এবং বিশ্বাসের বন্ধনটি গড়ে ওঠে। তারা যেন  তাদের চিন্তাভাবনা, অনুভূতি এবং সমস্যার কথা আপনাদের বলতে পারে।

বয়ঃসন্ধিকালের লক্ষণ

বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে ও মেয়েদের অনেক পরিবর্তন আসে যার কয়েকটি উপায় হলো-

ছেলেদের বয়ঃসন্ধিকালের লক্ষণ
  • ছেলেদের গড় বয়ঃসন্ধিকাল বয়স ১৪ বছর ।
  • দ্রুত লম্বা হতে থাকে । এছাড়া ছেলেদের কণ্ঠস্বর গাঢ়, ভারী ও গম্ভীর হয় এবং পুরুষদের মত চেহারা শুরু হয় ।
  • শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে লোম গজাতে শুরু করে ও দাঁড়ি গোঁফ উঠে ।
  • লিঙ্গ সুগঠিত ও কার্যক্ষম হয়ে ওঠে এবং শুক্রাণুসহ বীর্য উৎপন্ন হয় । রাতে স্বপ্নদোষ হয় ।
  • মুখে, বুকে এবং পিঠে ব্রণ হয় । শরীরের মাংস পেশী সুগঠিত ও বলিষ্ঠ হয়। এছাড়া মুখ ও পেটে মেদ বৃদ্ধি পায়।

 

মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালের লক্ষণ
  • বয়ঃসন্ধি শুরুর মেয়েদের গড় বয়স ১২ বছর ।
  • ঋতুস্রাব বা মাসিক শুরু হয়। তাছাড়া মেয়েদের সাদাস্রাব হতে পারে। মেয়েদের স্তন প্রচুর মেদ সঞ্চিত হয়ে সুডৌল ও উন্নত হয় এবং অনেক সময় স্তনের মাংসপেশী অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায় । ফলে স্তন খুব ব্যাথা করে।
  • মেয়েরা দ্রুত লম্বা হতে থাক ও চুল দ্রুত বড় হতে শুরু করে।
  • কণ্ঠ চিকন হয় ও ব্রণ হয়।
  • কোমর বড় হয় এবং ওজন বেড়ে যায়।

শারীরিক যত্ন:

বয়সন্ধিকালে শরীরকে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করতে হবে এবং এসময় প্রথম মাসিক হলে বড়দেরকে জানাতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে  যেমন স্যানিটারি ন্যাপকিন কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, কতক্ষণ পর্যন্ত এটি স্থায়ী হবে, কখন এটি পরিবর্তন করতে হবে এবং কীভাবে করতে হবে, সে সম্পর্কে জানতে হবে।  এসব কিছু অভিভাবকেরা খোলামেলাভাবে জানিয়ে দিবে।

মানসিক যত্ন:

বয়ঃসন্ধিকাল একটি অসুখ এটি  কখনোই ভাবা যাবে না এবং এ সময়ে নিজের মানসিক যত্ন নেওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে পছন্দের গান শোনা, বই পড়া, মুভি দেখা ইত্যাদি মন ভালো খুবই কার্যকর করে এবং এ সময়ে নিজের যত্ন নিতে শিখতে হবে। এসব দিকে অভিভাবকরা খেয়াল করবে।

বয়ঃসন্ধিকালে স্বাস্থ্যকর খাবার

বয়ঃসন্ধিতে যথেষ্ট আয়রনযুক্ত (লৌহ) খাবার না খেলে মেয়েদের রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। বয়ঃসন্ধিতে মেয়েদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মেনার্কি বা রজঃস্বলা হওয়া এবং মাসিকের দিনগুলোতে প্রতিদিন একটি মেয়ের এক মিলিগ্রাম করে আয়রন চলে যায়,এজন্য মেয়েদের আয়রন যুক্ত খাবার বেশি করে খেতে হবে।  ছেলেদের আয়রনের দৈনিক চাহিদা ১১ মিলিগ্রাম, মেয়েদের প্রায় ১৫ মিলিগ্রামের বেশিএবং  এই বাড়তি আয়রন পেতে আপনার মেয়েকে নিয়মিত সবুজ শাক,  কচু, কচুশাক, মাংস, কলিজা, ডিম, নানা ধরনের ফল, বিশেষ করে বেদানা, আনার, খেজুর, সফেদা, কিশমিশ ইত্যাদি খেতে দিন।

সঠিক ভাবে বেড়ে ওঠা ও পেশির বৃদ্ধির জন্য ৯ থেকে ১৩ বছর বয়সী মেয়ের দৈনিক ৩৪ গ্রাম আমিষ খাওয়া উচিত, এবং ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সে দৈনিক ৪৫ গ্রাম। এজন্য  প্রতিদিনি মাছ বা মাংস, ডিম, দুধ, বীজ ও ডালজাতীয় খাবার, নানা ধরনের বাদাম দিন মেয়েকে এবং যারা একটু খেলাধুলা করে, তাদের আমিষের চাহিদা আরও বেশি। এর বাইরে টিনএজ মেয়েদের আয়োডিন, জিঙ্ক ও ফলেট-জাতীয় খনিজের চাহিদা বেশি থাকে । এজন্য খেতে হবে সামুদ্রিক মাছ, সবুজ শাকসবজি ও ফল।

তা ছাড়া হাড়ের  সর্বোচ্চ ঘনত্ব তৈরি হয়ে যায় ১৮ থেকে ২১ বছরের আগেই, এরপর তা আর বাড়ে না এবং  তাই মজবুত হাড়ের জন্য খেতে হবে দুধ, দুগ্ধজাত খাবার যেমন: দই, পনির, কাঁটাযুক্ত ছোট মাছ, পাতাওয়ালা সবুজ সবজি ইত্যাদি।শারীরিক বৃদ্ধির জন্য এবং মজবুত হাড়ের জন্য টিনএজারদের প্রচুর ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি চাই এবং বয়স বাড়লে পুরুষদের তুলনায় নারীদের অস্টিওপোরোসিস বা হাক্ষয়ের ঝুঁকি বেশি থাকে  কারণ  একজন নারীকে সন্তান ধারণ করতে হয়, বুকের দুধ খাওয়াতে হয় যখন প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়ামের দরকার হয়। তাই  বয়সন্ধিকালে  হঠাৎ মুটিয়ে গেলে নানা ধরনের হরমোনজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং  মাসিক অনিয়মিত হয়ে পড়ে, মুখে লোম গজায় এবং এজন্য  অতিরিক্ত ক্যালরি-সম্পন্ন খাবার যেমন: ভাজাপোড়া, মিষ্টান্ন, কেক পেস্ট্রি, ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয় ইত্যাদি কম খাইতে হবে। আজকাল অনেক কিশোরী আবার স্লিম হওয়ার জন্য ক্রাশ ডায়েট করে, যা খুবই ক্ষতিকর।

Facebook Comments